করোনা ভাইরাস ও নিউইয়র্ক

667
নিয়াজ এম আনোয়ার

বর্তমানে নিউইয়র্ক স্টেটে মৃত্যু ১০০ জনের নীচে নেমে এসেছে এবং হাসপাতালে ভর্তি হারও অনেক কমে এসেছে। এত বাংলাদেশি আক্রান্ত হওয়া ও মৃত্যুর পেছনে কারন হিসেবে ছিল বাংলাদেশীদের কর্মজীবন, সচেতনতার অভাব,এমনকি ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনাচরণ ছিল দায়ী। জীবিকার তাগিদে ঘরের বাহিরে যাওয়া বা একসঙ্গে জমায়েত হয়ে আড্ডা দেয়া ,বাজার করা বা রাজনীতি নিয়ে মাঠ গরম করা এবং বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রম নিয়ে ব্যস্ততা বাংলাদেশী কমিউনিটিতে বেশী লক্ষণীয়।

শুরুর দিকে অনেকেই আক্রান্ত হয়েছেন ক্যাব চালাতে গিয়ে, নগদ অর্থের লেনদেন থেকেও আক্রান্ত হয়েছেন অনেকে কোন যাত্রীর সংস্পর্শে এসে।নিউইয়র্ক নগরীতে থেকে ক্যাব চালকদের বলা হয়েছিল,নগদ অর্থ পরিহার করে যাত্রীদের সার চার্জসহ ভাড়া ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ডেই নিতে।উবার চালকদের অনেকেই যাত্রীদের সংস্পর্শে এসে সংক্রমিত হয়েছিলেন।আমাদের গ্রোসারি স্টোরগুলো থেকেও অনেক আক্রান্তের ঘটনা ঘটেছিল,নগদ লেনদেন,অপরিচ্ছন্ন শপিং ট্রলি ব্যবহার করে বাজার করাও ছিল অন্যতম কারণ।

শুরুতে সতর্ক না হয়ে গ্রোসারি গুলিতে বাজার করা বা হোটেল-রেস্তোরাঁয় আড্ডা দেওয়ার মাশুল অনেক পরিবারকেই গুনতে হয়েছিল।নগদ অর্থের জন্য অপরিচ্ছন্ন এটিএম মেশিন ব্যবহার করার পর হাত সেনিটাইজ না করা বা হাত না ধোয়া ইত্যাদি।যথাযথ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করা যেমন, মুখে মাস্ক পরিধান না করা,হাত না ধোয়া হাতে গ্লাবস না পরা,নিরাপদ সামাজিক দুরত্ব বজায় না রাখা,সত্যি কথা বলতে গেলে কোন সতর্কতামূলক ব্যবস্থা সঠিকভাবে মানা হয়নি।ডাকবিভাগ বা বিভিন্ন কুরিয়ার সার্ভিস থেকে আসা চিঠিপত্র ও পার্সেল গ্রহণেও যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়নি।

করোনা ভাইরাস সংক্রমনে আমেরিকা প্রবাসী বাংলাদেশী আক্রান্ত ও মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে সবচেয়ে বেশি যা কমিউনিটিতে এশিয়ার অন্যান্য দেশ যেমন, ভারত,পাকিস্তান,নেপাল,শ্রীলঙ্কা এমনকি চীনা প্রবাসীদের আক্রান্ত হওয়া ও মারা যাওয়ার বেলায় তেমন ঘটেনি এর অন্যতম কারণ শিক্ষা ও উন্নত জীবনধারায় বাংলাদেশী প্রবাসীরা অনেকটা পিছিয়ে।বাংলাদেশী প্রবাসীদের বেশির ভাগ এখনো ভারত ও পাকিস্তানি  প্রবাসীদের মতো ভালো চাকরি বা উন্নত জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারেননি।

প্রবাসে  আমাদের বাংলাদেশী  কমিউনিটির অনেকের জীবনাচরণ অনেক ক্ষেত্রেই স্বাস্থ্যসম্মত নয়।দল বেঁধে আড্ডা দেওয়া,একই গ্রোসারিতে দলবদ্ধ হয়ে বাজার করা,রেস্টুরেন্টে ভিড় করাসহ স্বাস্থ্য সতর্কবাণীকে গুরুত্বের সঙ্গে না নেওয়াকে আজকের বাস্তবতার জন্য দায়ী।

নিউইয়র্কে বাংলাদেশি সংগঠন আছে কয়েক শত। সংগঠনগুলোর অনেকে করোনার প্রাদুর্ভাবের সময়ও একসঙ্গে নির্বাচনী প্রচার থেকে শুরু করে চায়ের আড্ডা মাতিয়েছেন বেশী,রেস্তোরাঁয় বসে সভা-সমাবেশ করেছেন।বেশির ভাগ প্রবাসী ক্যাব ড্রাইভার,উবার চালক,রেস্টুরেন্ট,ডেলিভারি এসব কাজ করেন।এমনকি দিন শেষে কাজ শেষে বন্ধু বান্ধব নিয়ে চায়ের আড্ডা ও একই ঘরে গাদাগাদি করে থাকাটাও ছিল অন্যতম একটি কারণ। ফলে অনেকেই এই ভুলের মাশুল দিয়েছেন।অনেকে নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলেছিলেন আবার অনেকে হারিয়েছেন আত্মীয় স্বজন।

লকডাউন জারির আগে নিউইয়র্কে করোনায় আক্রান্ত হওয়ার খবরে সবাই যখন আতঙ্কিত,তখনো প্রবাসী বাংলাদেশীদের মাঝে কোনো ধরনের সচেতনতা লক্ষ্য করা যায়নি,তারা সতর্কতামূলক কোন প্রকার প্রচার বা প্রস্তুতিতে যোগ দেননি।লক ডাউন শুরু হবার পরও অনেকে ছিলেন উদাসীন, হাসপাতাল গুলিতে মৃত্যুহার বৃদ্ধির সাথে সাথে অনেকে আতঙ্কিত ঘর বন্দি হয়ে পরেন,ততদিনে যা ঘটার তা ঘটে গেছে ,করোনা ভাইরাস ঘরে ঢুকে গিয়েছিল আর তাতে বেশীরভাগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল পরিবারের প্রবীণ সদস্যরা বা যারা বিভিন্ন ধরনের শারিরিক সমস্যায় ভুগছিলেন তারাই আক্রান্ত হয়েছিলেন বেশী ।

এখন নিউইয়র্ক স্টেটের অবস্থা অনেকটা স্থিতিশীল অবস্থার দিকেই যাচ্ছে ভাইরাস সংক্রমন ও মৃত্যুর হার কমা দেখেই বুঝা যায় , লক ডাউন উঠে যাবে সবকিছুই ধাপে ধাপে খুলে দেয়া হবে সেজন্য নিউইয়র্ক স্টেট গভর্ণর এন্ড্রু ক্যুমো সিটি মেয়র সিটির নাগরিকদের বেশী করে টেস্ট করার উপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বর্তমানে প্রতিদিন ২০০০০ হাজার টেস্ট করানো হচ্ছে যা জুন মাস থেকে ৫০০০০ হাজারে উন্নীত করার চেষ্টা করা হচ্ছে নিউইয়র্ক স্টেটের ১৭০ টি স্থান যেমন হাসপাতাল এবং সিটিমেড সেন্টর এর পাশাপাশি অ্যাডভান্টেজ কেয়ার ফিজিশিয়ান (এসিপি) সেন্টারগুলিতে ফ্রি টেস্ট করানো যাবে জুন মাস থেকে রাইটএইড ও ওয়ালগ্রীন ফার্মেসী গুলিতেও ফ্রি টেস্ট করানো যাবে।তাছাড়া টেস্ট করাতে ইচ্ছুক ব্যক্তিরা ৩১১ এ কল করে পাশাপাশি টেস্ট সেন্টার এর লোকেশন জেনে নিতে পারবেন ।

নিউইয়র্ক সিটি মেয়র ব্লাসিও নগরীতে  বহু ভাষায় পারদর্শী ১৭০০ ট্রেসার নিয়োগ দিতে যাচ্ছেন যাদের কাজ হবে করোনা ভাইরাস পজেটিভ রোগীরা কার কার সংস্পর্শে গিয়েছেন তা বের করে একটি তালিকা তৈরী করে তা সংরক্ষন করা এবং তাদের পর্যবেক্ষন করা।এজন্য সিটি নূতন একটি অ্যাপস ডাউনলোড করতে যাচ্ছে।যতদিন না করোনা ভাইরাসের টিকা মানবদেহে প্রবেশ না ততদিন পর্য্যন্ত সামাজিক দুরত্ব মেনে চলা , মাস্ক পরিধান করা ,হাত ধৌত করা , হ্যান্ড সেনিটাইজার ব্যবহার করা সহ যাবতীয় করোনা ভাইরাস সংক্রান্ত বিধিনিষেধ মেনে চলতে হবে ।লকডাউন উঠে গেলেও আমরা কোনভাবেই বলতে পারিনা যে আমরা করোনা ভাইরাস মুক্ত জীবন যাপন করছি।

সোস্যাল একটিভিষ্ট

নিয়াজ এম আনোয়ার, নিউইয়র্ক ।

(Visited 423 times, 1 visits today)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here