‘মাদকের আরও বড় গডফাদার আছে’

59

 ২০ মে দিনগত গভীর রাতে ‘মাদক ব্যবসায়ীদের’ নিজেদের মধ্যে গোলাগুলিতে নিহত আরও একজনের লাশ (ছবি- প্রতিনিধি)

 

যেসব এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাদকবিরোধী অভিযানে ‘মাদক ব্যবসায়ীরা বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছে, সেসব এলাকায় এর চেয়েও বড় বড় মাদক ব্যবসায়ী-গডফাদার রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। তারা এসব গডফাদারের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। এলাকায় এই ‘গডফাদাররা’ এখনও ঘুরে বেড়াচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন তারা।

মাদকের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চলমান অভিযানে গত ‘১৪ মে থেকে মঙ্গলবার (২২ মে) পর্যন্ত ৩৮ জন নিহত হয়েছে। র‌্যাবে দাবি করেছে, তাদের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ১৭ শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী নিহত হয়েছে। তবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেছে তারা সবাই শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী। স্থানীয়ভাবে করা সব মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকায় তাদের নাম রয়েছে। যেসব এলাকায় বন্দুযুদ্ধের ঘটনা ঘটেছে, সেসব এলাকার অধিকাংশ জনপ্রতিনিধি দাবি করেছেন, যারা নিহত হয়েছেন, তাদের বাইরেও আরো ‘গডফাদার’ আছে। তাদেরও আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।

যেসব জেলায় বন্দুকযুদ্ধে নিহতের ঘটনা ঘটেছে, সেগুলো হলো, চুয়াডাঙ্গা, নীলফামারী, দিনাজপুর, নেত্রকোনা, ফেনী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চট্টগ্রাম, যশোর, গাজীপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চট্টগ্রাম, সাতক্ষীরা, কুমিল্লা ও নারায়ণগঞ্জ।

সোমবার দিবাগত রাতে সৈয়দপুরের গোলাহাট বধ্যভূমি এলাকায় পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ দুই ব্যক্তি নিহত হন। তারা হলেন শহরের নিচু কলোনি এলাকার জনি (৩৪) ও ইসলামবাগ এলাকার শাহিন (৩২)। তারা সৈয়দপুর পৌরসভার বাসিন্দা।

এই দু’জন এলাকায় মাদক ব্যবসা করলেও তারা ওই এলাকার মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রক নয় বলে জানিয়েছেন সৈয়দপুর পৌরসভার মেয়র আমজাদ হোসেন সরকার। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এরা মাদকসেবী। এলাকায় ব্যবসাও করে। তবে তাদের গডফাদার রয়েছে। তারা ধরা পড়ছে না। যারা জাতিকে ধ্বংস করছে সেইসব গডফাদারদেরও গ্রেফতার করা উচিত। আইনের আওতায় নিয়ে আসা উচিত। নিহত দু’জন কোনও দল করতো না। তবে তারা অনেক ক্ষমতাশীল ছিল।’

সৈয়দপুর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অশোক কুমার পাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তারা মাদক ব্যবসায়ী। তাদের বিরুদ্ধে মাদক আইনে মামলাও রয়েছে।’

একই দিন নেত্রকোনা সদর উপজেলার মেদনী ইউনিয়নের বড়োয়ারী এলাকায় পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ আমজাদ হোসেন নামে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। মেদনী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জিল্লুর রহমান নোমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমজাদ হোসেন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। সে এলাকায় মাদক ব্যবসার পাশাপাশি আরো বিভিন্ন অপকর্মের সঙ্গে জড়িত ছিল। আমজাদ ছাড়া এলাকায় আরও অনেক মাদক ব্যবসায়ী রয়েছে। যাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। অভিযানের পর তাদের তৎপরতা কমলেও তারা ভবিষ্যতে আবার তৎপর হয়ে উঠবে।’

নেত্রকোনা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বোরহান উদ্দিন বলেন, ‘সোমবার রাত ২টার দিকে আমজাদ হোসেনকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তাকে সঙ্গে নিয়ে সদর উপজেলার বড়োয়ারী এলাকায় অভিযান চালানো হয়। ওই সময় আমজাদের সহযোগীরা পুলিশের ওপর হামলা চালালে বন্দুকযুদ্ধ শুরু হয়। এতে আমজাদ হোসেন নিহত হয়। আমজাদ নেত্রকোনা শহরের পশ্চিম নাগড়া এলাকার বাসিন্দা।’

এছাড়া সোমবার দিবাগত রাতে এভাবে ৯ জেলায় ১১ জন ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন। সোমবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল সচিবালয় সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘মাদকের কোনও চুনোপুটি ধরা হচ্ছে না। সবাই মাদকের শীর্ষ ব্যবসায়ী। তথ্য প্রমাণ নিয়েই তাদের নক করা হচ্ছে।’

গত তিন দিনে যশোরে র‍্যাবের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে এবং ‘নিজেদের মধ্যে গোলাগুলিতে’ সাত জন মারা গেছেন। পুলিশ ও র‍্যাবের দাবি, তারা সবাই মাদক ব্যবসায়ী। তবে স্থানীয় সূত্রের দাবি, ‘বন্দুকযুদ্ধে’ যারা নিহত হয়েছে, তাদের বেশিরভাগই ছিঁচকে মাদক ব্যবসায়ী। নওয়াপাড়া পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর রবীন অধিকারী ব্যাচা বলেন, ‘নিহত তিন জনই চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী। তারা এলাকায় সেবনসহ মাদক বেচাবিক্রির কাজ করতো।’

অভয়নগর থানার ওসি শেখ গণি মিয়া বলেন, ‘নিহত তিন জনই মাদক ব্যবসায়ী। তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে থানায় দুই থেকে চারটি করে মামলা রয়েছে।’

বিরামপুর উপজেলার কাটলা ইউনিয়নের মনিরামপুর এলাকায় সোমবার দিবাগত রাতে পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ প্রবল হোসেন (৩৫) নামের এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। পুলিশ বলছে, প্রবল হোসেন মাদক ও অস্ত্র ব্যবসায়ী ছিলেন। তার বাড়ি উপজেলার দক্ষিণ দামোদরপুর-বাসুপাড়া গ্রামে। বাবার নাম খলিলুর রহমান। বাবা দিনমজুর।

বিরামপুর উপজেলার কাটলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নাজির হোসেন বলেন, ‘একসময় ছোটখাটো ফেনসিডিল ব্যবসা করতো। তার বিরুদ্ধে তিন-চারটা মামলা আছে। তার পরিবার দাবি করেছে, ‍দুইবছর ধরে মাদক ব্যবসা করতো না। তার পাঁচ বছরের এক মেয়ে আছে। তার বাবা খুব বয়স্ক মানুষ। সে এখনও অন্যের বাড়িতে কাজ করে। তার দুইবোন শিক্ষিত। তাদের কারো বিয়ে হয়নি। তারা এনজিওতে চাকরি করে।’ তিনি বলেন, ‘প্রবল বড় মাদক ব্যবসায়ী না। তার চেয়েও বড় ব্যবসায়ী আছে। তাদের একজন নিজাম উদ্দিন। সে মাদক ব্যবসা করে গাড়ি বাড়ি করেছে। গতকাল পুলিশ তাকে ধরেছিল। সে পরে পালিয়েছে।’

চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমার এলাকায় এখনও ১০/১৫ জন বড় মাদক ব্যবসায়ী আছে। তাদের কেউ গ্রেফতার করে না।’ তিনি বলেন, ‘আমার কর্মীও থাকতে পারে। অস্বীকার করার কিছু নেই। তবে গড ফাদার কেউ নেই।’

গতকাল রাতে ফেনীর সদর উপজেলার লেমুয়া ব্রিজ এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে র‌্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মঞ্জুর আলম (৪৫) নামের এক ব্যক্তি নিহত হন।

লেমুয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নাসিমুল হাসান নাসিব জানান, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতেই অভিযান পরিচালিত হচ্ছে।’ মাদকের বিষয়ে কাউকেই ছাড় দেওয়া উচিত না বলেও তিনি মনে করেন।

বন্দুকযুদ্ধের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল মঙ্গলবার সচিবালয় সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘‘মাদকের কোনও চুনোপুঁটিদের ধরা হচ্ছে না। চুনোপুঁটিদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র থাকে না। যাদের ধরা হচ্ছে তারা মাদকের শীর্ষ ব্যবসায়ী।’ তিনি বলেন,  ‘শতভাগ নিশ্চিত হয়ে এবং তথ্য-প্রমাণ হাতে নিয়ে নক করা হচ্ছে। যাদের নক করা হচ্ছে, তারা কখনও কখনও পালিয়ে যাওয়ার সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর গুলি ছোড়ে। তখন জীবন বাঁচাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও পাল্টা গুলি ছোড়ে। এ কারণে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।’

এ পর্যন্ত  দুই হাজারের বেশি মাদক ব্যবসায়ীকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বিচার করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ, সংসদ সদস্য, সরকারি কর্মকর্তা, পুলিশ, র‍্যাব, সাংবাদিক যারাই মাদকের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকবেন, তাদের ছাড় নয় বলেও তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন।

(Visited 2 times, 1 visits today)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here